মুসলিম উম্মাহর পরিচয়  প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ

মুসলিম উম্মাহর পরিচয়  প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ
Loading...

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে কেবলমাত্র তার সন্তুষ্টির জন্য ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করার তওফিক দান করুণ। আমাদেরকে সকল প্রকার প্রদর্শনেচ্ছা, প্রপাগান্ডা থেকে দূরে থাকার তওফিক দান করুণ। নবী করীম (সঃ) ইরশাদ করেছেন- “যে তার কোন মুসলমান ভাইয়ের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ায় না, সে তাদেরদলভুক্ত নয়’।

মুসলিম উম্মাহর সমস্যায় ও তাদের দুঃখ কষ্টে আপনারা শরীক হয়েছেন বলে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রবাহিত রক্ত বন্ধ করার জন্য আপনারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে আপনাদের সকলের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একজন মুসলমানও যদি নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন আমাদেরকে তাদের পাশে থাকার তওফিক দান করেন।

আজকে আমরা মুসলিম বিশ্ব বুঝাতে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভৌগলিক কোন পরিচয়কে ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে আসব না। আজকে আমার এই আলোচনায় মুসলিম বিশ্ব বলতে- কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা কোন ভৌগলিক অঞ্চল কিংবা কোন দেশ সম্পর্কে কথা বলব না। মুসলিম পরিচয় ধারণকারী সকল মু’মিন ভাইদেরকে নিয়ে আজকে কথা বলব।

‘ইসলামী বিশ্ব’ এই পরিভাষাটি আমাদের সভ্যতার তৈরিকৃত কোন পরিভাষা নয়। ‘ইসলামী দুনিয়া’ বা ‘মুসলিম বিশ্ব’ এই পরিভাষাটি এই শতাব্দীর শুরুতে তৈরিকৃত একটি পরিভাষা। তারা(পাশ্চাত্য) এই পারিভাষিক শব্দের মাধ্যমে আমাদেরকে নির্দিষ্ট একটি ভুখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়। অথচ আল্লাহর কিতাব অনুসারে, পবিত্র কোরআনের মতে, “সমগ্র দুনিয়াই হল ইসলামের”। ইসলাম একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার মত কোন দ্বীন নয়। আমাদের রব বিশ্বজাহানের রব।

আমাদের প্রিয় নবীকে সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে সমগ্র বিশ্ব জাহানই হল ইসলামের। সমগ্র দুনিয়াই ইসলামের। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন,  ﴿أَفَغَيْرَ دِينِ اللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُ أَسْلَمَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا ﴾
“এখন কি এরা আল্লাহর আনুগত্যের পথ (আল্লাহর দীন) ত্যাগ করে অন্য কোন পথের সন্ধান করছে ? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহর হুকুমের কাছে সমর্পণ করেছে”।

এই সমর্পণ (تسلمية) কে আমরা কেবলমাত্র দুইভাগে ভাগ করতে পারি। একটা হল স্বেচ্ছায় সমর্পণ (تسلمية) আর অপরটি হল অনিচ্ছায় সমর্পণ (تسلمية)। আয়াতের শাব্দিক অর্থ করলে আমরা দেখতে পাই, সমগ্র মহাবিশ্বই মুসলমান। সমগ্র মহাবিশ্বই ইসলামের। ইসলামকে কেবলমাত্র ছোট একটি ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে, ছোট্ট একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে রাখা এবং শুধুমাত্র সে অঞ্চলকে মুসলিম বিশ্ব বলে আখ্যায়িত করা সম্ভব নয়।

প্রসিদ্ধ ভুল হিসেবেও যদি আমরা কোন একটি নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের জন্য, কোন এক ভৌগলিক অঞ্চলের জন্যও যদি ব্যবহার করি তাহলে আমরা মুসলিম বিশ্ব বলতে কোন অঞ্চলটিকে বুঝাচ্ছি?
হিজাজ অঞ্চলকে কি বুঝাচ্ছি?
নাকি বিলাদি শাম (শাম অঞ্চল) বা বিলাদী ইরাক (ইরাক অঞ্চল) কে বুঝাচ্ছি?
শুধু কি মধ্যপ্রাচ্যই ইসলামী বিশ্ব?
OIC র ৫৭ টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। শুধু কি এই ৫৭ টি রাষ্ট্র ইসলামী বিশ্ব?
ল্যাটিন অ্যামেরিকাতে বসবাসকারী ৭০ লক্ষ মুসলমানকে আমরা কোথায় রাখব?
রাশিয়াতে বসবাসকারী ৫ কোটি মুসলমানকে আমরা কোথায় রাখব?

চীনে ও চীনের উইঘুর অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানদেরকে কোন বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত করব?
কেবল মাত্র উইঘুর মুসলমানগণ যে ভূমিতে বসবাস করেন, তার পরিমান পাঁচটি ফ্রান্সের সমান! তাদেরকে আমরা কোথায় রাখব? তাছাড়া হাইতি থেকে ডমিনিক প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত, কিউবা থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত, ভিয়েতনাম থেকে জাপান পর্যন্ত, দুনিয়ার সকল প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এবং অন্তরে ইসলামের আলোকে সম্মানের সাথে ধারণকারী মু’মিন ভাইদেরকে কি আমরা ইসলামী বিশ্বের ( عالم اسلامي ( বাহিরে বলে বিবেচনা করব? আসলে মুসলিম বিশ্ব কোথায়?

বর্তমান সময়ে চারটি পরিভাষাকে এক সাথে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
১। মুসলিম দেশ সমূহ,
২। ইসলামী রাষ্ট্র সমূহ,
৩। ইসলামী অঞ্চল,
৪। মুসলিম বিশ্ব
এই প্রতিটি পরিভাষাতেই সমস্যা রয়েছে। যে সকল রাষ্ট্র ইসলামী আইন ও কানুন অনুসারে পরিচালিত হয় সে সকল রাষ্ট্রকে কেউ কেউ ইসলামী রাষ্ট্র বলে থাকেন। শুধুমাত্র সংবিধানে লেখাটাই কি যথেষ্ট? আমি মনে করি- মুসলিম দেশ, মুসলিম অঞ্চল, মুসলিম বিশ্ব এই শব্দ সমূহ মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদের মুসলমানদের জন্য যে সীমারেখা অঙ্কন করে দিয়েছে তার সাথে যথাযথভাবে খাপ খায় না। যে পরিভাষাটি আমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে তা হল ‘মুসলিম উম্মাহ’ । মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,
﴿إِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ﴾

“তোমাদের এ উম্মত আসলে একই উম্মত৷ আর আমি তোমাদের রব৷ কাজেই তোমরা আমার ইবাদাত করো”।
মহান আল্লাহ অন্য একটি আয়াতে বলেন,
﴿وَإِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ﴾
“আর তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো”।
আরবীতে ‘উম্মাতুন’ শব্দটি ‘উম্ম’ শব্দের সাথে একই উৎস (মাসদার) থেকে উদগত। উম্মুন অর্থ হল ‘মা’। আমরা একই মায়ের সন্তান। উম্মাহ হওয়ার অর্থ হল, একই মায়ের সন্তান হওয়া। রক্ত এবং দুধের সম্পর্কের ভাইয়ের চেয়ে ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্ব’ কে উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই উম্মাহকে একই সাথে ‘কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ’ হওয়ার দায়িত্বও প্রদান করেছেন। কোরআনের পরিভাষায় ইস্তিখলাফের দায়িত্ব দিয়েছে।

‘কেন্দ্রীয় উম্মাহ’ হওয়ার অর্থ হল দুনিয়ার গতিপথকে নিয়ন্ত্রণকারী উম্মাহ হওয়া। একপাশে ও কেনারায় দাঁড়িয়ে দুনিয়ার ঘটনা-প্রবাহ সমূহের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার নাম কেন্দ্রীয় উম্মাহ নয়।
কেন্দ্রীয় উম্মাহ হল,
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا
এখানে ব্যবহৃত ওয়াসাত শব্দটিকে ‘মধ্যপন্থা’ বলে অনুবাদ করতে পারি না। ওয়াসাত হল জগতের অক্ষ, বিশ্ব জাহানের কেন্দ্র, এমন একটি উম্মাহ যাদের চতুর্দিকে বিশ্বমানবতা ঘূর্ণায়মান হবে, অর্থাৎ আদিল (ন্যায় পরায়ণ একটি উম্মাহ)। মুসলিম উম্মাহ এমন উম্মাহ, যে উম্মাহ আদালতকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করে রাখবে।

এই আয়াতের ‘ওয়াসাত’ কালিমার উপর ভিত্তি করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে “মারকাজুল ওয়াসাতিয়্যা সমূহ’’ প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন চরমপন্থীদের মোকাবেলার নামে ‘লিবারেল ইসলাম সেন্টার’ নামক বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে।

অথচ আয়াতের পরবর্তী অংশে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ওয়াসাত’ শব্দের উদ্দেশ্য (মাকসাদ) কি সেটা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ

ইসলামের আদালতকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে সমগ্র মানবতার কাছে সাক্ষ্যদাতা হওয়ার জন্য। শহীদ এবং শাহীদ একই সাথে উদাহরণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বিষয়টি অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এভাবে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ

এই আয়াতের قسط শব্দটি এবং পূর্ববর্তী আয়াতের وَسَطً শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে আদালত(ন্যায়-বিচার) প্রতিষ্ঠার জন্য, নিজেদের জীবনে আদালতকে বাস্তবায়ন করে আদালতের প্রতীক হয়ে সমগ্র মানবতার সামনে নিজেদেরকে উপস্থাপন করবে এই উম্মাহ। এভাবে তারা খিলাফাত এবং ইসতিখলাফের দায়িত্ব পালন করবে এবং এভাবেই তারা কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ হবে। এর পাশাপাশি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই উম্মাহকে অন্য একটি দায়িত্ব দিয়ে বলেন

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল৷ তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য ৷ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ
“তোমরা নেকীর হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো”। এই আয়াতের অর্থ এটা নয় যে, তোমরা নিজেরা ঘরের মধ্যে বসে থেকে অন্যকে ভালো কাজের আদেশ দিবে। تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ এ আমর শব্দটি ক্রিয়াবাচক অর্থে, যা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হল, তোমরা মারুফের আলোকে জীবন যাপন করবে। ۖ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيدٍ এই আয়াতে আমর শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয় উপরোক্ত আয়াতে আমর শব্দটিও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ۖ وَمَا أَمْرُ فِرْعَوْنَ بِرَشِيد এই আয়াতে আমর শব্দটি আচরণ, কর্ম, এই সকল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ
তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও।
এসকল আয়াতের মূল কথা হল- তোমরা নিজেদের জীবনে মারুফকে বাস্তবায়ন করবে আর পৃথিবী থেকে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার নির্মূল করবে ও দূর করার চেষ্টা করবে।

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

Loading...