‘মুসলিম’দের কটাক্ষ এস কে সিন্হার ‘A Broken Dream’ বই নিষিদ্ধের দাবী

‘মুসলিম’দের কটাক্ষ এস কে সিন্হার ‘A Broken Dream’ বই নিষিদ্ধের দাবী
Loading...

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্হার ‘A Broken Dream’  (আ্য ব্রোকেন ড্রিম) বইয়ে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সংযোজন করে ‘মুসলিম’ বাংলাদেশের একমাত্র ক্ষুদ্র নৃ জনজাতিগোষ্টিভুক্ত ‘মুসলমান’দের কটাক্ষ করায় কমলগঞ্জের মুনিপুরী মুসলিম সম্প্রদায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

মঙ্গলবার (০৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কমলগঞ্জ তেতইগাঁ রশিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ মুনিপুরী মুসলিম ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বামডো) সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্হার ‘A Broken Dream’ বইয়ের লেখার কিছু অংশের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে একটা কুচক্রী মহলের সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্রের শিকার আজ আমরা। মণিপুরি মুসলমানরা বাংলাদেশের একমাত্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীভুক্ত মুসলমান জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এর প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্হা যিনি বহুবছর যাবত এদেশে আমাদের সাথে বসবাস করে আসছেন। তিনি বর্তমানে সুদূর আমেরিকায় অবস্থান করছেন। তিনি সেখানে বসে দেশ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন “Broken Dream” নামে। উক্ত বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ÒEarly LifeÓ  শিরোনামে মণিপুরিদের বিরুদ্ধে কিছু দূরভিসন্ধীমূলক মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন-যা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত, ষড়যন্ত্রমূলক। আমরা তার অসত্য আপত্তিকর,

বিভ্রান্তিকর, রাজনৈতিক দূরভিসন্ধিমূলক বইটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য এবং লেখকের বিরোদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মুনিপুরী মুসলিম ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বামডো) সংঘঠটির  সদস্যবৃন্দ ও কমলগঞ্জ এবং শ্রীমঙ্গলে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

তারা আরও বলেন, তিনি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মনিপুরী (মীতৈ) ও মণিপুরী মুসলমানদেরকে মনিপুরী না বলে Metai Hindus Sect  এবং Muslim Metai Sect ব্যবহার করেছেন অথচ বিষ্ণুপ্রিয়াদের ক্ষেত্রে Bishnupriya Sect of Manipuri  ড়ভ গধহরঢ়ঁৎর ব্যবহার করে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপপ্রয়াস করেছেন। তিনি মুসলীগ পরিবারের সাথে থেকে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি সমস্ত মনিপুরী মুসলমানদেরকে পাকিস্থানপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আবার স্ববিরোধি বক্তব্যও দিয়েছেন।

সম্মেলনে আরও বলা হয়, আজ থেকে প্রায় দুইশতাধিক বছর পূর্বে রাজনৈতিক উৎপীড়নের শিকার হয়ে আমরা এ ভ‚খন্ডে এসেছিলাম। তবে আমাদের শিকড় আরো প্রসারিত এবং এদেশেই প্রথিত। আপনারা জানেন ষোড়ষ শতাব্দীর শেষের দিকে মোগল শক্তি বাংলার রাজধানী দখল করলেও দেশের পূর্ব সীমান্ত ছিল স্বাধীনচেতা জমিদার ও আফগান নেতাদের সম্পূর্ণ দখলে।তখনকার সময়ে এই সিলেট অঞ্চল শাসন করতেন খাজা ওসমান খাঁন লোহানী, দ্বিতীয় বায়োজিদ কররানী প্রমূখ পাঠান শাসকরা।তখনকার দিনে মণিপুরের রাজপরিবারে সৃষ্ট গৃহ বিবাদের ফলশ্রুতিতে রাজভ্রাতা শানোংবা মণিপুর রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পার্শ¦বর্তী রাজ্য কাছাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।

আর এরই ধারাবাহিকতায় কাছাড়রাজা সিদ্ধান্ত নেই মণিপুর আক্রমনের।তখনকার সিলেটের পাঠান শক্তির সাথে কাছাড় রাজার ছিল সৌহার্দপূর্ন ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কাছাড়ের রাজা সিলেটের পাঠান শক্তির কাছে সৈন্য পাঠাতে অনুরোধ করেন। আর এতে সাড়া দিয়ে প্রায় সহ¯্রাধিক সৈন্য মণিপুর আক্রমনে কাছাড়কে সাহায্য করার জন্য প্রেরণ করেন। যুদ্ধের একটি পর্যায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারনে প্রেরিত সেই সৈন্য,থেকে যায় মণিপুরে তাদেরকে সেখানে পুনর্বাসন করা হয় মণিপুরি মেয়ে বিবাহ দিয়ে। মণিপুরি ভাষা ও কৃষ্টি গ্রহণ এবং ইসলাম ধর্মকে ধারণ করে সৃষ্টি হয় এক নতুন মণিপুরি মুসলমান জাতির।

এ নতুন জনগোষ্ঠী বৃহত্তর বাংলা থেকে আগত বলে তাদের নামকরণ করা হয় “বাঙাল,” যা পরবর্তীতে রূপান্তরিত হয়ে যায় “পাঙাল” এ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তধারা হয়ত আপনাদের মধ্যেও কারো কারো দেহে প্রবাহিত। আপনাদের সেই অতি নিকটজন, পরমাত্বীয় “পাঙাল” তথা মনিপুরি মুসলমান জাতি আজ গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। স্মরনাতীত কাল থেকে আজ অবধি আমরা এ দেশের বৃহত্তর বাঙালী জনগোষ্ঠীর সাথে কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে একাত্ব হয়ে বসবাস করে আসছি। কোন দিন কোন অঘটন ঘটেনি।

বাংলার জনগণের প্রতিটি আন্দোলনে প্রতিটি সংকটে আমরা থেকেছি আপনাদের সহযোগী হয়ে। সেই ১৯৪৭ এ অনুষ্ঠিত গণভোট থেকে শুরু করে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এবং নির্বাচনে আমরা মণিপুরি মুসলমানরা প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ ও মতামতকে মূল্যায়ন করে আমাদের সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করেছি।প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে আমাদের নিজ ভাষাজ্ঞান করে আসছি। কারণ আমাদের স্কুল জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলের বাহিরে সংঘটিত প্রতিটি কাজ, আলাপ আলোচনা ঘটে বাংলা ভাষার মাধ্যমে।

তাই ১৯৫২ সালে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলার জনগণের মাতৃভাষা বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানলে মণিপুরি ছাত্র জনতা তার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। প্রতিবাদে প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবে প্রতিবেশী বাঙালীদের উপর নেমে আসা প্রতিটি জুলুম অত্যাচারের অংশিদার হয় আমরাও।উনসত্তরের গণআন্দোলনেও আমরা অংশগ্রহণ করি। ছয় দফা আন্দোলন ও পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীকার আন্দোলনে ও আমারা সক্রিয় অংশ গ্রহণ করি।

যার ফলশ্রæতিতে সত্তরের নির্বাচনে অবিচ্ছিন্নভাবে আমরা সমর্থন জানায় আওয়ামীলীগকে। তৎকালীন সময়ে আমাদের ভোট কেন্দ্রগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলেই বেরিয়ে আসবে তার প্রমাণ। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করি আমরা।বহু বছর যাবত এদেশের বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে পাশাপাশি অবস্থানের ফলে একে অপরের প্রতি গড়ে ওঠা সহমর্মিতার বহি:প্রকাশ ঘটায় আমরা।

কমলগঞ্জের মণিপুরি গ্রামগুলোর অবস্থান সীমান্ত অঞ্চলে হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন তথ্য ও খবরাখবর আদানপ্রদানের মাধ্যমে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল আমাদের গ্রামগুলো।তাছাড়াও ভারতের হালহালী ও মানিক ভান্ডারসহ গোটা ত্রিপুরায় বসবাসরত মণিপুরি মুসলমানরা যে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে তা মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীরা আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

সম্মেলনে উপস্থিতরা বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতির মনিপুরী মুসলমান সম্পর্কে এরুপ অসত্য তথ্য, হীনস্বার্থ চরিথার্ত, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার শামিল ও বিশেষ ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়কে হেয় করার অপচেষ্টা

Loading...