বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের অবস্থান ও তাদের সার্বিক অবস্থা (1) প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ

বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের অবস্থান
Loading...

আমরা যখন মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের কোথাও মুসলিম বিশ্ব, ইসলামী বিশ্ব, ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী রাষ্ট্র সমূহ এই সকল শব্দ ব্যবহার করেনি। এই সকল শব্দের পরিবর্তে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আমাদেরকে মুসলিম উম্মাহ বলে সম্বোধন করেছে। এসকল দিকের বিবেচনায় ফিকাহ শাস্রের ‘দারুল ইসলাম’ শব্দের ক্ষেত্রে আমি নিজে একজন হানাফী মাজহাবের অনুসারী হওয়ার পরেও ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদকে গুরুত্ত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

তার মতে- “একটি জমিনে বা একটি ভূখণ্ডে ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কিয়ামত পর্যন্ত সেই অঞ্চল দারুল ইসলাম”। তাই আমি মনে করি আন্দালুসিয়া এখনো দারুল ইসলাম হিসেবেই আমাদের অন্তরে স্থান দখল করে আছে। সকল মুসলমান যেন কিয়ামত পর্যন্ত এই চিন্তা ও চেতনার আলোকে নিজেদেরকে গড়ে তুলে। কোরআন আমাদের জন্য যে পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে বা নির্বাচন করেছে তা হল ‘মুসলিম উম্মাহ’। আজকের ভূগোলবিদরা, স্ট্রাটেজিস্টরা পশ্চিমে মরক্কো, মরিতানিয়া সেনেগাল থেকে শুরু হয়ে পূর্বে চীন-তুর্কিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অঞ্চলকে মুসলিম বিশ্ব বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

এর মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সমূহ রয়েছে। যদি আমরা কেবলমাত্র এই অঞ্চলকেই মুসলিম বিশ্ব হিসেবে মনে করে থাকি তাহলে আমাদেরকে এই কথাটি বলতে হবে যে, এই অঞ্চলেই সর্বপ্রথম মানুষ বিশ্বের বুকে পা রেখে তার অস্তিত্বের জানান দেয়। অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের বংশধারা এখান থেকেই শুরু হয়েছে। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (সঃ) সকল নবী রাসূল গণ মহান আল্লাহর বানী নিয়ে সর্বপ্রথম এই অঞ্চলেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। সকল বড় বড় সভ্যতার জন্ম এই অঞ্চলেই হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সবচেয়ে বড় বড় নিয়মত সমূহও এই অঞ্চলে দান করেছেন।

এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী প্রাকৃতিক সম্পদ মওজুদ রয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাবসায়িক রাস্তাসমূহও এই অঞ্চল দিয়েই বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ অঞ্চলটি হল সমগ্র দুনিয়ার কালব বা অন্তর। এ অঞ্চল না হলে দুনিয়া তার জীবন প্রবাহকে অব্যাহত রাখতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বলতেছি, এই দুনিয়াই (অঞ্চলটিই) যদি কেবলমাত্র মুসলিম বিশ্ব হয়, তাহলে এই অঞ্চল হল সমগ্র বড় বড় সভ্যতার উৎসমূল। এত গুরত্বপূর্ণ অঞ্চল হওয়ার কারণে কিয়ামত পর্যন্ত এই অঞ্চলের উপর সকলের সতর্ক দৃষ্টি থাকবে।

যদি মুসলমানগণ ঐক্যবদ্ধ না হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের খেলার পুতুল হওয়া থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে না পারে, এই অঞ্চলকে যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শক্তি প্রদর্শনের অসুস্থ খেলা থেকে বের করে না আনতে পারে, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত এই অঞ্চলে দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগেই থাকবে।  এই অঞ্চলে আজ রক্তাক্ত ভূমিসমূহ রয়েছে। আবার কোন ক্রমে একটু হলেই ব্যান্ডেজ করে হাসপাতালের বেডে শুইয়ে রাখা রয়েছে এমন অঞ্চল সমূহও রয়েছে। ইয়েমেন আজ রক্ত-গঙ্গায় ভাসছে, সিরিয়াতে রক্তপাত এখনো বন্ধ হয়নি, ইরাক তার যখমকে এখনো শুকাতে সক্ষম হয়নি, লিবিয়াতে গৃহযুদ্ধ এখনো বিদ্যমান,

মিশর আপাতদৃষ্টিতে তার কিছু যখম শুকাতে সক্ষম হয়েছে, এক কথায় বলতে গেলে পাশ্চাত্যের পরিভাষায় মুসলিম অঞ্চল এখনো বড় বড় সংকটে নিমজ্জিত।  উত্তর দিকে মালাবি-মোজাম্বিক, দক্ষিনে আলবেনিয়া, কাজাকিস্তান, ওজবেকিস্তান এসকল অঞ্চল সহ বিশেষ করে শেষ শতাব্দীতে এই অঞ্চল সমূহ থেকে অন্যান্য অঞ্চল সমূহে অনেক মানুষ অভিবাসিত হয়েছে। এই অঞ্চল থেকে (মুসলিম বিশ্ব নামক এই অঞ্চল থেকে) অনেক মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অভিবাসিত হয়েছে। যুদ্ধ, দারিদ্রতা এবং শিক্ষা গ্রহণের জন্য অনেক মানুষ এই অঞ্চল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অভিবাসিত হয়েছে।

শুধুমাত্র নিজেদের বাসভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে অনেক মানুষ বিভিন্ন দেশে বসবাস করা শুরু করেছে। ফিলিস্তিনিগণ, বসনিয়াবাসীগণ, চেচেনিয়াবাসীগণ, ক্রাইমিয়ান তাতারগণ, আহস্কি তারকিশগণ এবং আফ্রিকা থেকে বিশেষ করে পৃথিবীর সকল প্রান্তে শোষিত মুহাজির নামক একটি বড় জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সের শোষণের পরে আলজেরিয়া এবং মরক্কো থেকে বিশাল এক জনগোষ্ঠী ফ্রান্সে অভিবাসিত হয়েছে, হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ড অভিমুখী অভিবাসিত এক বিশাল জনগোষ্ঠী , ইন্দোনেশিয়া থেকে হল্যান্ড অভিমুখী অভিবাসীগণ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইউরোপ অভিমুখে যাত্রাকারী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং অঞ্চল থেকে অ্যামেরিকা, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া অভিমুখে যাত্রাকারী অভিবাসীগণকেও সামনে রেখে এই সকল পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

প্রিয় ভাইয়েরা,
আমি আমার সরকারী দায়িত্ব পালনকালে সমগ্র পৃথিবীতে বসবাসকারী সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে আপনাদের সামনে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আমি যে সকল মানুষকে একদম কাছ থেকে দেখেছি এবং কাছ থেকে চিনেছি তাদের সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।  আমি ৯ টি পয়েন্টে সমগ্র পৃথিবীতে বসবাসকারী মুসলমাদের সম্পর্কে আপনাদেরকে সংক্ষিপ্তভাবে অবগত করার চেষ্টা করব। এই বিষয়টি অনেক বড় হওয়ায়র দরুন অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী আপনাদের মুসলিম ভাইদের সম্পর্কে ৯ টি পয়েন্টে আপনাদের সামনে মুসলিম উম্মাহর অবস্থানকে তুলে ধরার চেষ্টা করব যেন তা আপনাদের মাথায় এবং অন্তরে একটি চিত্র অঙ্কিত করে দেয়।

একঃ রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেশিয়া এবং বাল্টিক প্রজাতান্ত্রিক দেশসমূহে বসবাসকারী মুসলমানগণ সম্পর্কে।
সরকারী হিসাব মতে রাশিয়াতে প্রায় ৩০ মিলিয়িন (৩ কোটি) মুসলমান রয়েছে। বেসরকারী হিসাব মতে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা আরও অনেক বেশী(কারও মতে ৫ কোটি)। অতীতের পুরাতন ছোট ছোট রিপাবলিকান দেশ সমূহ রয়েছে। যদিও অর্থের দিক থেকে অনেক বড়। তাতারিস্তান কাজান যেটার রাজধানী, চুবাশিস্তান, বাশ কুর্দিস্তান শুধুমাত্র কয়েকটি। আসলে এই অঞ্চল সমূহে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এক প্রকারের মুজিজা।
প্রিয় ভাইয়েরা, এই উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে আপনাদের একজন ভাই হিসেবে, খুব গুরুত্ত্বপূর্ণ একটি উপদেশ দিতে চাই। যদিও আপনাদেরকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।

রাসূলে আকরাম (সঃ) এরপরে বিশেষ করে মক্কা এবং মদীনায় ইসলাম একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল এই সম্পর্কে আমাদের সন্তানদেরকে জানানো এবং আমাদের নিজেদের খুব ভালোভাবে জানা উচিত। এটি জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ইনতিশারি ইসলাম (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস) ওরিয়েন্টালিস্টরা লিখেছে, আমরা এখনো লিখতে পারি নাই। প্রতিটি অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ইসলামের এক একটি মুজিজা। চীনের পেকিন শহরের একটি মসজিদে আমার খুতবা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল সে মসজিদটি আজ থেকে ১১০০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

আমি এটা দেখে আশ্চর্যান্বিত হলে সেখানে অবস্থানরত মুসলমানগণ আমাকে বলেন যে, চীনের অন্য একটি অঞ্চলে ১৩০০ বছরের প্রাচীন মসজিদ রয়েছে।  এই কাজান অঞ্চলে আমরা যে অঞ্চলকে তাতারিস্তান নামে অভিহিত করে থাকি, এই ইদিল-ভলগা নদীর পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের নাম হল ‘বুলগার ইসলামী রাষ্ট্র’। এই রাষ্ট্রটি ১১৪০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১১৪০ বছর পূর্বে সেখানে শান-শৌকতে পূর্ণ একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরে কাজান হানলি, ওরদু রাষ্ট্রসহ আরও অনেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

তাদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের গবেষণা করা প্রয়োজন। আফ্রিকাতে ইসলাম কিভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে? একটু পরে ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে আলোচনা করব। ইন্দোনেশিয়াকে আমরা বাহিরে ফেলে রেখে দিয়েছি। কারণ পাশ্চাত্যের ভূগোলবিদদের নামাঙ্কিত মুসলিম বিশ্বের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিকের অঞ্চল সমূহ একটুও স্থান পায়নি। অথচ ২৫০ মিলিয়ন মুসলমান নিয়ে ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র। ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়া সহ এদের আশে পাশে ২৬ টির বেশী দ্বীপ-উপদ্বীপ রয়েছে। এই সকল দ্বীপের প্রত্যেকটিতেই মুসলমানগণ রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া কিভাবে মুসলমান হল? ইয়েমেনের উপর দিয়ে যাওয়া মুসলমান ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। আমি সব সময় এই কথাটি উল্লেখ করে থাকি। ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পড়ার সময় আমি খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাই। আমি মনে করতাম যে, পৃথিবীতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছে আলেমগণ কিন্তু আমি ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পড়ে জানতে পারি যে, পৃথিবীর সকল স্থানে ইসলামের বাণী সর্বপ্রথম পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ব্যাবসায়ীগণ। এই সম্মানের মালিক সৎ ব্যবসায়ীগণ।

এর কারণ কি? এই উত্তর পাওয়ার জন্য গবেষণা করে যা পাই তা হল, ব্যবসায়ীগণ আলেম-উলামাদের মত আগে ঈমান এবং ইলিম নিয়ে যায় নাই। তারা সর্বপ্রথম হালাল এবং আখলাককে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ঈমান এবং ইসলামকে নিয়ে যায়।  আগে গিয়েছিল হালাল এবং আখলাক, পরে যায় ঈমান এবং ইসলাম।  আফ্রিকা মহাদেশের দেশ ক্যামেরুন, মোজাম্বিক, সোমালিয়া এবং কেনিয়াতে ইসলাম কিভাবে হাবশিস্তান (ইথিওপিয়া) এর মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছিল আমাদের সন্তানদেরকে এইসব কিছু জানানো প্রয়োজন।  আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাসে ২ টি বিষয় থাকা উচিত।
১। সারা পৃথিবীতে ইসলাম কিভাবে প্রচারিত হয়েছে।
২। মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা।

অনুবাদ করেছেনঃ বুরহান উদ্দিন

Loading...