ঝিনাইদহে শোক দিবসে যাওয়া নিয়ে সরকারি দলে বিরোধ, ৩২ টি পরিবার গ্রামছাড়া

ঝিনাইদহে শোক দিবসে যাওয়া নিয়ে সরকারি দলে বিরোধ, ৩২ টি পরিবার গ্রামছাড়া
Loading...

রামিম হাসান,ঝিনাইদহ থেকেঃ
পার-খালকোলা গ্রামের ৩২ টি পরিবারের পুরুষেরা গ্রামে ঢুকতে পারছেন না। গত ৫৫ দিন তারা গ্রামছাড়া হয়ে নানা স্থানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। বেশ কয়েকজনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। আর বাড়ির মেয়েরা সন্ধ্যা হলেই ঘরের
দরজা বন্ধ করছেন, বিশেষ প্রয়োজনেও খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। মাঠে প্রায় ৭৫ বিঘা জমির ধান পরিচর্জার অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ধান গাছগুলো সব মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাসি বলছেন জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে যাওয়া নিয়ে সরকারি দলের
দুই পক্ষের বিরোধে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

যারা গ্রামছাড়া হয়েছেন তারা সকলেই সাবেক সাংসদ আব্দুল মান্নানের আয়োজনে শোক দিবসের অনুষ্ঠানে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে বাঁধাগ্রস্থ হন। প্রতিপক্ষরা তাদের ওই সভায় যেতে বাঁধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর থেকে তারা গ্রামছাড়া রয়েছেন। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের একটি গ্রাম পার-খালকোলা। স্থানিয়রা জানান, এই গ্রামে সরকার দলের দুইটি পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন, অপর পক্ষে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান।

ঝিনাইদহে শোক দিবসে যাওয়া নিয়ে সরকারি দলে বিরোধ,  ৩২ টি পরিবার গ্রামছাড়া

মোদাচ্ছের হোসেন কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনারের সমর্থক ও মিজানুর রহমান একই উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ আব্দুল মান্নানের সমর্থক। স্থানিয় নেতারা জানান, তাদের গ্রামের মতো উপজেলা পর্যায়েও সরকারি দলের মধ্যে দুইটি ভাগ রয়েছে। যার কারনে এবছর ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস পৃথক দুইদিন পালিত হয়েছে।

১৫ আগষ্ট বতর্মান সাংসদ আনোয়ারুল আজিম ও ১৬ আগষ্ট সাবেক সাংসদ আব্দুল মান্নান এই কর্মসুচি পালন করেন। উভয়ই পর পর দুইদিন সমাবেশের আয়োজন করেন। গ্রামাঞ্চলেও নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সেভাবে সমাবেশে আসার জন্য বলা হয়। যারা আনারের সমর্থক তারা ১৫ তারিখে আর যারা মান্নানের সমর্থক তারা ১৬ তারিখে সমাবেশে উপস্থিত হন। সরেজমিনে পার-খালকোলা গ্রামে গিয়ে কথা হয় ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতা সঙ্গে।

নাম প্রকাশ না করে তিনি জানান, ১৫ আগষ্ট চেয়ারম্যান মোদাচ্ছেন হোসেনের সমর্থকরা বাজনা বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে কালীগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে যান। ১৬ আগষ্টের সমাবেশে মিজানুর রহমানের সমর্থকরা যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলে গ্রামেই তাদের বাঁধা দেওয়া হয়। পূর্বের দিন যারা সমাবেশে গিয়েছিলেন তারাই পরের দিন অন্যদের যাবার বিষয়ে বাঁধা দেন। ওই সমাবেশে না যাবার জন্য চাপও সৃষ্টি করেন।

কিন্তু বাঁধাদারকারীদের কথা না শুনে তারা যাবার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ। প্রথমে কোলা বাজারে জামাল ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সামনে ও পরে গ্রামে এই সংঘষে ছড়িয়ে পড়ে। এতে উভয় পক্ষের ৪/৫ জন আহত হন। মোদাচ্ছের হোসেনের সমর্থক ইমাদুল হোসেন গুরুত্বর আহত হন। আর মিজানুর রহমানের সমর্থক রজব আলী, রবিউল ইসলাম, ফজলুর রহমান ও সেলিম হোসেন সামান্য আহত হন। এ সময় কোলা বাজারে থাকা মিজানুর রহমানের দোকান ভাংচুর হয়। এই সংঘর্ষের বিষয়ে নিয়ে উভয়পক্ষ মামলা দায়ের করেন।

মিজানুর রহমান জানান, ইমাদুল হোসেন দাবি হয়ে তাদের পক্ষের ১০ জনকে আসামী করে থানায় মামলা দায়ের করেন। যে মামলায় তারা সবাই জামিনে আছেন। আর তারা ১৮ জনকে আসামী করে আদালতে একটি মামলা দিয়েছেন। যে মামরাটি পিবিআই তদন্ত করছেন। আওয়ামীলীগ নেতা মিজানুর রহমান আরো জানান, তারা সকলেই একই দল আওয়ামীলীগ করেন। দলের মধ্যে বিরোধে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে হাজির হয়েছেন। এখন জামিনে আছেন। কিন্তু ১৬ তারিখের ঘটনার পর থেকে তাদের ৩২ টি পরিবারের পুরুষ ছেলেদের বাড়িতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। মাঠে ফসলের ক্ষেত পরিচর্জা করতে
দিচ্ছে না। ওই গ্রামের রজব আলী জানান, ঘটনার পর থেকে তিনি গ্রামছাড়া। তার মতো সেলিম রেজা, রজব আলী, নাজিম উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, নজরুল ইসরাম, আব্দুর রশিদ, ওয়াহিদুল ইসলাম, মইনুদ্দিন, সবুজ মিয়া, জহির উদ্দিন সহ ৩২ টি পরিবার গ্রামছাড়া।

যাদের দিন-রাতগুলো কোথায় কিভাবে রাত কাটাছে তা বলে বোঝানো যাবে না। তিনি আরো জানান, তাদের নেতা মিজানুর রহমানের সার-ঔষধের দোকান, আনারুল ইসলামের মুদি দোকান ও মাজেদুল ইসলামের চায়ের দোকানও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বাড়িছাড়া ৩২ টি পরিবারের সদস্যদের ৭৫ বিঘা জমিতে ধান রযেছে। যা সবই সার-ঔষধ আর পানি না দেওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার ভাইরা ইসাহক আলীকে জমিতে পানি নেওয়ার জন্য বলেছিলেন। তিনি ক্ষেতে পানি দিতে গেলে তাকেও মারপিট করা হয়েছে। এমনকি তাদের বাচ্চারা এতোদিন স্কুলে যেতে পারছিলেন না।

পরীক্ষার পূর্বে বাচ্চাদের মায়েরা প্রতিপক্ষের নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন জানান, ঘটনাটি মারামারি নয়। যারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে রয়েছে বলে শুনেছেন তারা অপরপক্ষকে মারপিট করে বাড়ি ছেড়েছেন। মারধর করার পর তারা নিজেরাই পালিয়ে রয়েছেন। তাদের কেউ গ্রামছাড়া করেনি। আর কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইউনুচ আলী জানান, বিষয়টি তিনি দেখবেন।

Loading...