কুড়িগ্রামের চরের কৃষকরা তিন ফসলে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছেন

কুড়িগ্রামের চরের কৃষকরা তিন ফসলে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছেন
Loading...

মমিনুল ইসলাম বাবু (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের কৃষকদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এই অভাবী মানুষগুলোর ব্যাপারে কৃষি
বিভাগেরও রয়েছে উদাসীনতা। কিন্তু এর মধ্যেই পেটের দায় ও নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন কিছু কৃষক।
লাভজনক ফসল ও উন্নত চাষ পদ্ধতি খুব দ্রুতই সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে তাদের। তবে প্রচারণা ও সচেতনতার অভাবে এ জ্ঞান চরের অন্য কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে না।

সরকারি হিসাবে কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় চার শতাধিক চরে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে আবাদি জমি প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর। কিন্তু আজো এ জমিতে আধুনিক কৃষির ছোঁয়া লাগেনি। সরকারি কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি। দুটি এনজিও স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় কিছু ভূমিহীন চাষীকে দিয়ে মিষ্টিকুমড়া চাষ করে সফলতা দেখালেও পরে লাভজনক না হওয়ায় চাষীরাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

ফলে চরাঞ্চলে বসবাসকারী লক্ষাধিক কৃষক ঘুরেফিরে সনাতন পদ্ধতিতে নিজেদের সংরক্ষিত বীজ দিয়েই কাউন, গম, ধান, তিল, তিসি, সরিষা উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। স্থানীয় জাত ও সনাতন পদ্ধতি হওয়ায় এ ফলন দিয়ে কখনই বছরের খাবার সংকুলান হয়নি। ফলে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকেও মেলেনি মুক্তি। তবে এরই মধ্যে কিছু কৃষক সমৃদ্ধির চাবি পেয়ে গেছেন। দুই-তিন বছর ধরে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন কৃষক ভুট্টা, চিনাবাদাম ও মরিচের চাষ শুরু করেছেন।

তারা কৃষি বিভাগের কোনো পরামর্শ ছাড়াই চরের বাইরের কৃষকদের দেখাদেখি উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ করে এ ফসলগুলো চাষ করছেন। এ কৃষকদের আর্থিক অবস্থাও রাতারাতি পাল্টে গেছে। চরাঞ্চলে এ তিনটি ফসল কী পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে জানতে জেলা কৃষি বিভাগে যোগাযোগ করা হলে তারা জেলার লক্ষ্যমাত্রা ও মোট উৎপাদনের হিসাব দিতে পারলেও আলাদা করে চরের কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের ধরলা নদীর অববাহিকার চরাঞ্চল সারডোবের সাটকালুয়া চর গ্রামের ভুট্টা ও মরিচচাষী কৃষক মজিবর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। চরে হাতে গোনা যে কজন চাষী এ লাভজনক ফসলগুলো চাষ করছেন তিনি তার মধ্যে একজন। মজিবর রহমান, চার বছর আগে বাজার থেকে ভুট্টার বীজ সংগ্রহ করে এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে বপন করেন। নিজের বুদ্ধিতে ভুট্টার আবাদ করে সে বছর ভালো ফলন পান, লাভও হয়। পরের বছর ব্র্যাক অফিস থেকে বিনামূল্যে ছয় কেজি ভুট্টাবীজ পান। এবার এক একরে বপন করেন। ফলন পান ৮০ মণ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি।

গত বছর থেকে মরিচ চাষও শুরু করেছেন। অন্য ফসলের আবাদ কমিয়ে এখন ভুট্টা আর মরিচেই মনোযোগ দিয়েছেন তিনি। একই চরে মজিবর রহমানের দেখাদেখি ভুট্টা ও মরিচের চাষ শুরু করেছেন তালুকদার, তৈয়ব, বাবর, মোরশেদসহ আরো ১০-১২ জন কৃষক। তাদের মধ্যে মোরশেদ গত বছর চিনাবাদাম চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। এ কৃষকরা মজিবরের পরামর্শ নিয়ে এসব ফসল চাষ করে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছেন।

চরের ভুট্টা, মরিচ ও চিনাবাদাম চাষীরা মনে করেন, কৃষি বিভাগের মাধ্যমে উন্নত বীজ ও পরামর্শ দিয়ে এ তিন অর্থকরী ফসল জেলার নয় উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে দিতে পারলে চরাঞ্চলের মানুষের আর অভাব থাকবে না। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে নদ-নদীর অববাহিকায় ২৩০টি চরে ২৯ হাজার ৮২৪ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২২২টি চরের ২২ হাজার ৫৪৯ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. মোস্তাফিজার রহমান প্রধান বলেন, চরের কৃষকরা ধান, ভুট্টা, চিনাবাদাম, মরিচ, গম, কাউন, চিনা, তিল, কলাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন। এর মধ্যে কম পরিশ্রমে, স্বল্প খরচে বেশি লাভজনক ফসল ভুট্টা, চিনাবাদাম ও মরিচ চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। যদিও চরের কৃষকদের জন্য কী করা হচ্ছে, চরের কোথায় কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী প্লট আছে এসবের কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি। অবশ্য এ বছর থেকে চর উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হবে বলে জানান তিনি।

 

Loading...