ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যৎ (১)  প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ

ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যৎ (১)  প্রফেসর ডঃ মেহমেদ গরমেজ
Loading...

আজকের এই শিক্ষা সেমিনারে ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আপনাদের সামনে আলোচনা করতে চাই। মহান রবের প্রদত্ত আকলকে ব্যবহার করে আমাদেরকে সবসময় চিন্তা (তাফাক্কুর) করতে বলা হয়েছে। আমাদের দ্বীন ইসলামে তাফাক্কুর (চিন্তা) কে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিছু কিছু হাদীসে ১ ঘণ্টা চিন্তা (তাফাক্কুর) করাকে হাজার রাকায়াত নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা কোন বিষয়ে তাফাক্কুর (চিন্তা) করব? এই বিষয়টি নির্ধারণ করাও গুরত্ত্বপূর্ণ। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন تفكر (চিন্তা) শব্দের সাথে تذّكر এবং تدبُّر শব্দ সমূহেরও ব্যবহার করেছেন। শুধুমাত্র বর্তমানকে নিয়ে তাফাক্কুর (চিন্তা) করাই আমাদের দায়িত্ব নয়। تذّكر (স্মরণ) হল অতীত নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা। تفكر (তাফাক্কুর) হল বর্তমানকে নিয়ে চিন্তা করা আর تدبُّر (তাদাব্বুর) হল আমাদের পরিণতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা।
পবিত্র কোরআন সবসময়

أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ
أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ

আমাদেরকে একই সাথে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার জন্য আহবান করেছে। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের একটি ভুল/ ঘাটতি রয়েছে।

আমরা অতীত নিয়ে অনেক আলোচনা করি কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক ঘাটতি বা দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের অনেক চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন।

কারণ تدبُّر (তাদাব্বুর) বিহীন تدبير তদবীর সম্ভব নয়। তদবীর (প্রতিরক্ষা, পূর্বপ্রস্তুতি) ছাড়া একটি উম্মাহ কক্ষনোই ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করতে পারবে না। تذّكر করার জন্য যেমন تذكير এর প্রয়োজন, تفكر এর জন্য যেমন تفكير এর প্রয়োজন তেমনি ভাবে تدبُّر (তাদাব্বুর) এর জন্য تدبير (তদ্বির) এর প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও অন্য একটি শব্দ আছে تعّبر ।
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
অর্থাৎঃ হে দৃষ্টিশক্তির অধিকারীরা, শিক্ষাগ্রহণ করো৷

এই আয়াতের মাধ্যমে আবার শিক্ষাগ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এ শিক্ষা একই সাথে যেন আমাদের কথা বার্তায় প্রতিফলিত হয়। এজন্য একজন মুসলমানের প্রতিটি লেখাই ইবারা। ইবারার দ্বারা ইবরাত (শিক্ষা) প্রতিফলিত হয়। ইবরাত (শিক্ষা) কে প্রকাশ ও প্রতিফলিত করার জন্য প্রয়োজন تعبّر (তা’য়াব্বুর)। تعبّر (তা’য়াব্বুর) এর জন্য تدبُّر (তাদাব্বুর) প্রয়োজন, تدبُّر (তাদাব্বুর) এর জন্য تذّكر প্রয়োজন।

কারণ যে অতীতকে বুঝতে পারে না, সে ভবিষ্যৎকেও বুঝতে পারবে না।

এই পারিভাষিক ভূমিকার পরে আমি যে কথাটি বলতে চাই, তা হলঃ আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তিনটি বড় ভূল রয়েছে।

একটি হল; আখেরী জামান শব্দকে ব্যাপকভাবে প্রচার করা। এই প্রচারণা দিয়ে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করতে পারব না।

দ্বিতীয়ত; আমাদের অন্ধকারের দিকে ধাবিতকারী ফিতনা-ফাসাদকে ব্যাপকভাবে সামনে নিয়ে আসা এবং এ বিষয়সমূহকে জোরেসোরে প্রচার করা। ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে অনেক খারাপ ও একটি দুঃসময়। এই ধরণের ভুল চিন্তা।

তৃতীয়ত; একজন মহান মানুষ আসবেন যিনি আমাদেরকে রক্ষা করবেন, এই ধরণের চিন্তাকে ছড়িয়ে দিয়ে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ত্বকে পালন না করে দায়িত্ত্ব পালনে অবহেলা করা।

এ ধরণের চিন্তাকে লালন করলে আমাদের পক্ষে ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন কাজই করা সম্ভব নয়।

ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যতকে যদি আমরা মহাগ্রন্থ আল-কোরআন দিয়ে ব্যাখা করি তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, এই তিনটি চিন্তাই ভুল। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ

অর্থাৎঃ আল্লাহই তার রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি একে সকল প্রকার দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন।

এই আয়াতটিকে আমরা যদি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই, তিনি তার রাসূলকে এই জন্য সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন যেন তার এই দ্বীন সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী হয়। তার প্রেরিত দ্বীন যেন এই পৃথিবীতে হক্ব, হাকীকত, আদালত, আখলাককে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে।

আমরা যখন কোরআনকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো করে পড়ি তখন আমরা দেখতে পাই যে, কোরআন আমাদেরকে অতীত থেকে খুব ভালোভাবে শিক্ষা নিতে বলে।

أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا ۖ فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَٰكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ

“তারা কি পৃথিবীর বুকে ভ্রমণ করেনি, যার ফলে তারা উপলব্ধিকারী হৃদয় ও শ্রবণকারী কানের অধিকারী হতো? আসল ব্যাপার হচ্ছে, চোখ অন্ধ হয় না বরং হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়, যা বুকের মধ্যে আছে৷”

আল-কোরআনে احسن القصص (সর্বোত্তম কিসসা) নামে যত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে প্রতিটি ঘটনাই মুসলমানদেরকে ইতিহাস সম্পর্কে একটি দৃষ্টিভঙ্গী পেশ করে।
ইতিহাস আমাদের কিভাবে বুঝতে হবে? হযরত আদম (আঃ) দিয়ে শুরু হওয়া নবীদের ইতিহাস আমাদেরকে অতীত নিয়ে চিন্তা করার ব্যাপারে একটি দৃষ্টিভঙ্গী পেশ করে। নবীদের সম্পর্কে বর্ণিত আয়াত সমূহ অতীত থেকে আমাদের কিভাবে শিক্ষা নিতে হবে এটা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলে।

আমরা যখন সূরা বাকারা পড়ি তখন আমরা দেখতে পাই যে, সূরা বাকারা তিনভাগের দুই ভাগ আয়াত বনী ইসরাইলের ইতিহাস সম্পর্কে। শুধুমাত্র বনী-ইসরাইলের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই সূরার তিনভাগের দুই ভাগে তাদেরকে নিয়ে আলোচনা করেননি। বরং তারা যে সকল ভুলভ্রান্তি করেছে সেই সকল ভুলভ্রান্তি যেন আমরা না করি এবং তারা যে সকল খারাপ কাজ করেছে সে সকল খারাপ কাজ থেকে আমরা যেন দূরে থেকে আমাদের ভবিষ্যতকে বিনির্মাণ করতে পারি সে জন্যই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের সম্পর্কে এত বেশী আলোচনা করেছেন।

প্রিয় যুবক ভাইয়েরা,
আমাদের সভ্যতা অনেক বড় একটি পথ পাড়ি দিয়ে এই পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতা এমন একটি সভ্যতা যে সভ্যতা হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর সময় থেকে দুনিয়ার সকল অঞ্চলে, সকল মানুষকে নবজীবন দান করে বড় বড় সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে সামনের দিকে ধাবমান হয়েছে। এই উম্মাহর সকল সদস্যের উচিত হল, ইসলামী সভ্যতা সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা। ইসলাম মক্কা ও মদীনায় স্থিতিশীলতা অর্জন করার পরে মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক অঞ্চলের মানুষের জীবনকে অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে পরিবর্তন করেছিল, অল্প সময়ের মধ্যে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছাল?

-স্পেনে কিভাবে আন্দালুসিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিল?

-মধ্য এশিয়ায় মাওয়ারায়ুন নাহর সভ্যতা কিভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল?

সমগ্র পৃথিবীকে কিভাবে পরিচালনা করেছিল এবং পরিচালনা করার সময় কোন ধরনের সমস্যার মুখোমুখী হয়েছিল এবং এই ধরণের সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য কি কি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিয়েছিল এ সকল বিষয়কে না জেনে ইসলামী সভ্যতার ভবিষ্যতকে বুঝা অনেক কঠিন। তাই আমাদেরকে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসকে খুব ভালোভাবে জানতে হবে।

আমরা মুসলমানরা ৩ টি বিষয়ে অনেক বেশী ইখতিলাফ করে থাকি, যে সকল ইখতিলাফ (মতবিরোধ) মাঝেমধ্যে দ্বন্দ ও সংঘাতের পথ তৈরি করে।

১। অতীতকে বুঝার ক্ষেত্রে। আমাদের অতীত যে অনেক বেশী সমৃদ্ধ ছিল এবং অনন্য-সাধারণ ছিল এক্ষেত্রে সকলেই একমত। কিন্তু আমাদের সেই অতীতকে বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী এবং পর্যালোচনা ভিন্ন ভিন্ন। অথচ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইতিহাসকে সঠিকভাবে বুঝার জন্য আমাদেরকে আদেশ করেছেন। কোরআনে কারীম তার সকল মু’মিন পাঠককে একই সাথে সঠিক একটি ইতিহাস দর্শন শিক্ষা দিয়ে থাকে।

২। আমাদেরকে নিজেদের অবস্থানকে বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা ইখতিলাফ (মতভেদ) করে থাকি। কারণ এই ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে জ্ঞান নেই।

৩। ইসলামী সভ্যতার, মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশী ইখতিলাফ করে থাকি। (চলবে)

অনুবাদঃ বুরহান উদ্দিন

Loading...