আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’
Loading...

‘আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি কামের জন্য, কাম করমু, ভাত খামু, পয়সা ইনকাম কইরা পোলাপান মানুষ করমু। কষ্টের লাইগা গেছি।’ ২০১৫ সালে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা এক নারীকর্মী এই কথা বলেছিলেন বিবিসি বাংলার কাছে। তার পর আড়াই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, সৌদি আরব থেকে নারীকর্মী ফিরে আসা থামেনি; প্রতি মাসেই এখন নাকি গড়ে ২০০-র মতো নারীকর্মী ফিরে আসছেন দেশে।

যারা ফিরে আসছেন, তাদের সবাই অবশ্য ২০১৫ সালেই ফিরে আসা সেই নারীটির মতো সরাসরি বলছেন না যে, দেহ ব্যবসা করতে রাজি নন বলে ফিরে এসেছেন; কিন্তুআকারে-ইঙ্গিতে সবাই যা বলছেন, তার এ ছাড়া অন্য কোনো অর্থও হয় না। এদের অনেকে সৌদি আরব থেকেই দেশে ফিরছেন মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কী সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ ছেড়েছিলেন- পরিবারে টাকা পাঠাবেন, সন্তানদের মানুষ করবেন; সেসব স্বপ্নই হারিয়ে গেছে তাদের।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে, আমরাই আমাদের এই মেয়েদের বাঘের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। যে অদম্য মেয়েরা তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে অজানা দেশের অভাবনীয় পরিস্থিতিতে যেতে পিছপা নয়, তাদের আমরা ‘রেমিট্যান্স মেশিন’ ছাড়া আর কিছুই ভাবছি না।নির্লিপ্ত কণ্ঠে আমরা গত সোমবারও এক মন্ত্রীকে বলতে শুনেছি, সৌদি আরবে নারীকর্মীরা ভালোই আছেন। আর ফিরে আসা নারীকর্মীরাও নাকি এখন আবার সেখানে যেতে চাইছেন! তিনি যা বলেছেন, তার সঙ্গে সৌদী আরবের সরকারি পর্যায়ের মানুষজনের বক্তব্যের কোনো তফাৎ নেই। তার মতে, এই নারী কর্মীদের মূল সমস্যা হচ্ছে আরবি ভাষা বলতে ও বুঝতে না পারার সমস্যা, দেশের বাড়ির প্রতি গভীর নাড়ির টানের সমস্যা। মন্ত্রী বুঝতে নারাজ, তাই যদি হতো, তা হলে তো মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো দেশ থেকেই প্রায় একই গতিতে নারীকর্মীদের ফিরে আসার কথা। কিন্তু নারীকর্মীরা ফিরছেন মূলত সৌদি আরব থেকে। লেখাবাহুল্য, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছেন সাড়ে সাত লাখের মতো নারীকর্মী; আর সৌদি আরবে কাজ করছেন আড়াই লাখের মতো নারীকর্মী। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদারের বক্তব্য তো আরও ভয়াবহ, তিনি বলছেন,যে নারীকর্মীরা ফিরে আসছেন, তাদের অধিকাংশই নাকি নির্যাতনের গল্প বানাচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেই যখন এমন সব কথা বলা হয়, তখন আর আমাদের বলার কী থাকে! অথচ ইন্দোনেশিয়া কিংবা ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখেছি? ইন্দোনেশিয়ার দুই নারীকর্মীর শিরোচ্ছেদ ঘটিয়ে সৌদি আরব প্রচার করেছিল, ওরা হত্যা করেছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া নিজেদের উদ্যোগে তদন্ত করে দেখতে পেয়েছিল, যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তারা হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। তার পর থেকে সেখানে নারীকর্মী পাঠানো তারা বন্ধ করে দিয়েছে। ফিলিপাইনও নানা অভিযোগ পেয়ে সংসদীয় তদন্ত দল পাঠিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পায়, আরও অনেক নির্যাতন তো আছেই, যৌন নির্যাতনও করা হচ্ছে তাদের দেশের নারীকর্মীদের ওপর। ফিলিপাইনও সেখানে নারীকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রীলঙ্কা, ভারতের মতো দেশগুলোও। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সুবিধা হলো, তাদের নিজেদের সাফাই গাওয়ার কিংবা অসত্য বলার প্রয়োজন পড়ছে না- তাদের হয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাই নানা কথা বলছে। যেমন, বাংলাদেশের ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল ২০১৬ সালে সৌদি আরব থেকে ঘুরে এসেছে বলেছেন, নারীকর্মীদের ফেরার কারণ নির্যাতন নয়, তারা ফিরে আসছে ভাষা বুঝতে আর খাওয়াদাওয়া করতে সমস্যা হয় বলে,দেশের প্রতি অতিরিক্ত টান অনুভব করেন বলে। চলতি মাসে জাতীয় সংসদেও আমরা একই ধরনের কথা বলতে শুনেছি রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কাউকে।

অথচ প্রথম থেকেই বেশ স্পষ্টভাবেই এটি জানা যাচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশেই, বিশেষ করে সৌদি আরবে নারীকর্মীদের মূলত যৌন নিপীড়নের মুখে পড়তে হচ্ছে।আর সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের এই জনশক্তি রপ্তানির মূল চেহারাটা যে কী, তা বোঝার জন্যে বোধকরি মাত্র এই একটি তথ্যই যথেষ্ট যে, দীর্ঘ সাত বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালে এই দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়েছিল বিনা খরচে নারীকর্মী পাঠানোর মধ্যে দিয়ে। নারীকর্মী পাঠানোর আগে বাংলাদেশ একবারও খতিয়ে দেখেনি, লাভজনক হওয়ার পরও ফিলিপাইন্স ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো কেন সেখানে নারীকর্মী না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথবা, কে জানে, খতিয়ে হয়তো দেখা হয়েছে, জেনেশুনেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উহ্যই রাখা হয়েছে; যার পেছনে রাজনৈতিক বিশেষ কোনো কারণ থাকাও অস্বাভাবিক নয়।

তবে তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে নারীকর্মীরা ফিরে আসতে শুরু করলে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দেশ থেকেও সৌদি আরবে যেতে আগ্রহী নারীর সংখ্যা কমতে থাকলে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সেখানকার কর্তৃপক্ষকে নারীকর্মীর সঙ্গে তার স্বামী কিংবা পুরুষ নিকটাত্মীয়কেও নিয়োগের প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাবে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রথমে রাজি হলেও কিছুদিনের মধ্যেই বেঁকে বসে এবং ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে এভাবে নিয়োগ দেয়া বন্ধ করে দেয়।

যে নারীকর্মীরা সৌদি আরব থেকে ফিরে আসছেন, পরিস্থিতি বোঝার জন্যে তাদের মুখের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। সেখানে শুধু ক্লান্তির নয়, উদ্বেগ আর আতঙ্কের ছাপও সুস্পষ্ট। ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর মাইগ্রেশনস রাইটস বাংলাদেশ তো সেই ২০১৬ সালেই জানিয়েছে, বাংলাদেশের নারীকর্মীদের সেখানে শুধু গৃহস্থালির কাজই নয়, যৌনদাসীর কাজও করতে হচ্ছে। তার পরও আমরা যেন তামাশা দেখছি। গত মে মাসের এক সংবাদে আমরা জানতে পেরেছিলাম, প্রতি মাসে গড়ে ২০০ জনের মতো নারীকর্মী ফিরে আসছেন। যে নারীকর্মীরা ফিরে আসছেন, তাদের আর তাদের পরিবারও ফিরিয় নিতে চাইছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজি হলেও, মেয়েটিকে দিনরাত কাটাতে হচ্ছে একঘরে হয়ে। আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, কেউ কেউ দেশে ফিরে আসছেন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে!

মনে হয়, চোখের সামনে আবারও ১৯৭২ সালকে দেখতে পাচ্ছি, দেশের স্বাধীনতার জন্যে ধর্ষিতা হতে হয়েছে নারীকে-কিন্তু তাকে আর ঠাঁই দিতে রাজি নয় দেশ কিংবা পরিবার! এখানেও তাই- ওদের আমরা ‘রেমিটেন্স মেশিনের’ মতো ব্যবহার করতে চাইছি, পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্নপূরণের জন্যে বলি দিতে চাইছি; আর অনোন্যপায় হয়ে ওরা যখন দেশে ফিরে আসছে, তখন বাড়ির চৌকাঠও পেরুতে দিচ্ছি না! কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রাই কি সব? অনাগত দিনের আদালত যদি এই পর্যবেক্ষণ দেয়, রেমিটেন্সের জন্যে আমরা নারীকর্মীদের নিয়ে যা করছি, তা আসলে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে তাদের ভিন দেশে পাচারেরই নামান্তর, তা হলে কী জবাব দেব আমরা?

Loading...