আমার বাবা, ইসহাক খান, ০১ – পর্ব

আমার বাবা
Loading...

লেখক : ইসহাক খান
মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

০১ – পর্ব
আমি ছিলাম পিতামাতার অবাধ্য এবং অপ্রিয় সন্তান। উঠতে বসতে বাবা আমাকে বকা ঝকা করতেন। তার ক্ষুব্ধতার বড় কারণ ছিল আমি ঠিকমতো লেখাপড়া করি না। বাবা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতেন, তোকেতো কখনো বই নিয়ে বসতে দেখি না। কি করে খাবি তুই?

নিয়তির কি রহস্যময় খেলা। শেষ জীবনে বাবার ঠিকানা হলো এই অবাধ্য অপ্রিয় সন্তানের বাসা। আমরা ছিলাম চার ভাই তিন বোন। আমার বড় দুইভাই বাবার খুব প্রিয় ছিল। সেই প্রিয়তা ক্রমে দূরে সরে যায়। বাবাকে একা রেখে তারা আলাদা সংসার শুরু করে। ততদিনে মা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বাবা বাড়িতে একা থাকতেন। একজন কাজের মহিলা তাকে রান্না করে দিতেন। তাঁর একা জীবন আমি মেনে নিতে পারতাম না। অনেকবার তাকে বলেছি, ঢাকায় চলেন। বাবা রাজি হননি। মজা করে বলেছেন, দেশের একটা কুকুর দেখলেও ভাল লাগে। ঢাকায় গিয়ে তোমাদের বাসায় আমাকে বন্দি থাকতে হবে।

একদিন হঠাৎ বাবার জন্য মনটা কেমন করতে লাগলো। কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। বাড়িতে পৌছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। আমি বাড়িতে গিয়ে দেখি বাবার ঘর অন্ধকার। আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। তবে কি…. আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আস্তে করে ডাক দিলাম, বাবা। অমনি বাবার ভরাট কণ্ঠস্বর আমাকে আলোড়িত করে তুললো।

বাজান আইছো? বললাম, ঘর অন্ধকার কেন? বাবা বললেন, কাজের মহিলা আজ আসেনি। ওর জ্বর। বললাম, বাড়িতে আরও মানুষ আছে। তারা?  বাবা বললেন, ওদের অনেকবার ডেকেছি কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। আমার বুক ফেটে কান্না উঠে এলো। বাবাকে বললাম, আপনি ঢাকায় চলেন। বাবা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, আমি তোমার সঙ্গে থাকবো।

বাবাকে ঢাকায় আনার তোরজোড় শুরু হয়ে গেল। সকালে বাবা আমাকে ডেকে বললেন, তোমার চাচাদের ডেকে নিয়ে এসো। ওদের কিছু কথা বলবো আমি।  আমি গিয়ে চাচাদের ডেকে নিয়ে এলাম। তারা আমার আপন চাচা নয়। বাবার চাচাতো ভাই। চাচারা এলে বাবা তাদের পাশে বসতে বললেন। বাবা পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তি। সবার মুরুব্বি। সবাই বাবাকে সমিহ করতেন। বাবার কাছে পরামর্শের জন্য আসতেন। আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছি। বাবা কিছুক্ষণ দম নিয়ে ভারি গলায় বললেন, আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি। তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা জানি না। তোমরা নিজেরা মিলেমিশে থকবে। নিজেদের মধ্যে কখনো কলহ করবেনা।

এই কথা শোনার জন্য আমার চাচারা প্রস্তুত ছিলেন না। সবাই আঁতকে উঠলেন। নজির চাচা বাবার হাত ধরে কান্না শুরু করলেন। তাঁর কান্না বাকিদেরও সংক্রামিত করলো। সবাই শিশুর মতো হাউ-মাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মমতাজ চাচা কাঁদতে কাঁদতে বাইরে এলেন। রাগী স্বভাবের এই চাচা পেশায় দলিল লেখক। রেগে গেলে কথা বলেন গলা ফাটিয়ে। তিনি আমার দুইভাইকে ডেকে এনে বকতে লাগলেন। কেমন ছেলে তোমরা? ভাই ঢাকায় চলে যাচ্ছে তোমাদের কিছুই করার নাই? কেমন ছেলে তোমরা?

বাবা গম্ভীর কণ্ঠে মমতাজ চাচাকে ডেকে বললেন, তুমি ওদের কিছু বলো না। আমি নিয়ত করেছি ইসহাকের বাসায় যাব। এই নিয়ে তোমরা আর কথা বাড়িও না। আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে বাবার কথা শুনে কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। যে আমি বাবার অবাধ্য অপ্রিয় সন্তান, এস এস সি পরীক্ষার আগে যে সন্তানকে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন, আজ সেই অপ্রিয় সন্তানের কাছে যাওয়ার আকুতি দেখে আমি কেঁদে ফেললাম।

চাচারা তখনো কাঁদছেন আর বলছেন, আমাদের মাথার উপর থেকে ছাদ সরে গেল। কে আমাদের আশা দেবে? বিপদে কে আমাদের ভরসা দেবে? তাদের কান্নায় উঠোনে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। সবাই বাবার হাত ধরে দোয়া নিচ্ছেন। মাফ চাচ্ছেন। বড়ভাই এসে বাবার পা ধরে বসে রইলেন। বাবাকে দেখলাম নিরাবেগ। শান্ত। আমাকে বললেন, টিকিট কাটা হয়েছে?
জি বাবা।  বড়ভাইকে বাবা বললেন, শেষ জীবনে সবারই আশ্রয় দরকার হয়। আমি চাই তুমিও সেই আশ্রয় থেকে বঞ্চিত না হও। শুরু হলো বাবার ঢাকার জীবন। রাতারাতি আমি পিতা হয়ে গেলাম। বাবা হয়ে গেল আমার পুত্র। [চলবে]

Loading...