“তিনটি” কবিতায় কবি বিকাশ মজুমদার।

“তিনটি” কবিতায় কবি বিকাশ মজুমদার।

একঃ

ঐ দূর পাহাড়ের উপর সুচালো পাথর খণ্ড কিছু বলতে চায়,
নিশ্চয় তার ইচ্ছা এবং চাহিদা আছে, অপূর্ণতায় তার মনে হয় রাগ হয়।
ঐ যে পাহাড়ের নিচে হিজল গাছ জলে ফেলে দিয়েছে কানের দুল,
পিছন থেকে ডাকে অশরীরী, ” আয় ডুবে মর, ফুলের রেণু খুঁজে।”
পাহাড়ের গা ফুটে বেরোনো ঝর্ণা ছুটে চলে বসন্ত বরাবর,
তার পিছন পিছন ধানের ক্ষেত, আধুনিক নেকড়ে আর আকাশে ভাসমান কাক।

পাহাড়, হিজল, ঝর্ণা সবাই ভীষণ জীবন্ত।
যে মাটিতে পুতে রাখি মানুষ অথবা পুড়িয়ে ফেলি,
অদৃশ্য তারা রয়ে যায়,
কবর থেকে জন্ম নেয়া গাছ, আগুনের ছাই থেকে উড়ে যাওয়া পাখি আমাকে ডাকে।
মাথার খুব মাঝখানে,
সন্ধ্যেয় ঘর ফেরত মানুষ অভিজ্ঞতার শব্দ শুনতে পায়,
তাদের কানের কাছে বাতাসের ফিসফিসানি,
” স্যাপিয়েন্স, তোমার সন্তানদের বলবে, পথে পথে পড়ে আছে কত কত হাড়, মাথার খুলি, পাথরের অস্ত্র। ”

দুইঃ

কবে তার মুখে এলো বুলি,
অনর্থক শব্দের উপর আরোপিত হলো দ্যোতনা,
ফ্লাই বললেই পাখি উড়ে গেল ফুড়ুৎ?
কবে সে দেখলো দাবানলের আগুনে ব্রহ্মার মুখ,
সেখানে ঢালতে হবে ঘি যজ্ঞের আহুতি?
কখন তামাকপাতা, সাগরের মৃত ঝিনুক হয়ে গেল কড়ি,
ধনুকের টংকার থেকে সুরের উপর কোমল গান্ধার?
কে তাকে শেখালো প্যাপিরাস ঘাস নয় কাগজের আভাস?
সেখানে লেখা যায় গুহার চিত্রার্পিত প্রতীক,
কে জানতো রক্তজবার শরীরে লেগে আছে কালি!
কবে নগরে এলো পুরন্দর,
আর মধুমতীর তীরে বটতলায় গড়ে উঠল মিউনিখ সিটি?
কবে সে যুদ্ধবন্দি, মৃত্যুর অভাবে অন্নের দাস,
যার পায়ে এখনো উত্তরাধিকার শৃঙ্খল?
বলতে পারো কবে থেকে সে মালিকবিহীন ভোগের দাস,
আর ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তার জন্য?

তিনঃ

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐযে হিন্দুপাড়ার ঘরবাড়ি
পুড়ছে গরুসমেত গোয়াল, খড়ের গাঁদা,
সোনার গয়নার স্তুপ, গীতা এবং মহাভারত।
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে হিন্দুর বাস্তুভিটা।

ভীষণ পুড়ছে চুতুর্দিকে জতুগৃহ, ভিতরে তালাবদ্ধ মানুষ।
পুড়ছে মলনের খুঁটিতে বাঁধা ছাগল, পঞ্জিকা, চুলার হাড়িতে ভাত,
টাকা পয়সা ও হিন্দু বাড়ির দলিল।
মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিলে যেমন ধেয়ে ছুটে আসে
লাঠি চাপাতি হাতে নামাজরত মুসল্লির দল,
তেমনি সবাই পোড়াচ্ছে যে যেমন পারছে কামাতে সোয়াব,
আর বাঁচাতে দ্বীনি এলেম।
এগারো বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে উদ্ভ্রান্ত জননী ছুটে এসেছে দাবানলের সামনে,
আর বলছে বাবারা আমাকে করো, মেয়েটা এখনো অনেক ছোট।
অদূরে আগুনের লকলকে ফাঁড়া জিভের খেলা, চারিদিক সলক, যেন নাটকের আলোক প্রক্ষেপণ।
ভেঙ্গে পড়ছে ঘরের খুঁটি, ঘরপোড়া আগুনের পটপটে শব্দ সবখানে।
হিন্দুদের গায়ে শ্মশানের মানুষ পোড়া ছাই,
ভয়ে কাঁপছে থরো থরো।
কিশোরী বলছে কাকে যেন ‘এই তরল আগুন থেকে বাঁচাও,
তলোয়ারের এককোপে দ্বিখণ্ডিত করে দাও।
আমাকে কেটে কুচিকুচি করে ফেল যেন মটর কলইয়ের শাক,
কিংবা গরুর মাংসের কিমা,
আমাকে থেঁতলে দাও চাপাতির ঘাড়া দিয়ে’।

দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐযে হিন্দুপাড়ার ঘরবাড়ি
আমাদের চারিদিকে জেহাদি মানুষের চোখে হিংসার আগুন, চাপাতির ঝনঝনানি,
কিশোরী বলেছিল, আমাকে মেরো ফেলো, কচুকাটা করো,
কাপুরুষ আমি তাও বলতে পারিনি।

[শামসুর রাহমানের ‘তুমি বলেছিলে’ কবিতা অবলম্বনে]

Comments

comments