বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে হবে এশিয়াকেই

বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনে এশীয় দেশগুলো কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে, সে পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নানা চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতে জর্জরিত বর্তমান বিশ্ব কাঠামোতে কীভাবে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমতার ভিত্তিতে উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’ সম্মেলনে। খবর বাসস ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

উন্নত এশিয়া গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৫টি ধারণা পেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানবতা আর শুভশক্তির জয় হবেই। বিশ্ব আজ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, এই উদীয়মান এশিয়ার দিকে।

উদ্ভাবনে, অনুপ্রেরণায় বিশ্বকে শান্তি আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এশিয়াকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।’ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও তাত্ত্বিকদের অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার সকালে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে নিক্কেই সম্মেলনের উদ্বোধন হয়।

জাপানি সম্প্রচারমাধ্যম নিক্কেইয়ের এ আয়োজনকে এশিয়ার সম্ভাবনা ও উত্থান নিয়ে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ছাড়াও ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি’ মাহাথির মোহাম্মদ, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এবং ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে অংশ নিচ্ছেন এ সম্মেলনে।

শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার গল্প সম্মেলনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য উদারীকরণের নীতি সমর্থন করে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতির বাধা ক্রমশ বাড়ছে।

বিভিন্ন দেশের এ সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি বিশ্বে বাণিজ্যযুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে। ‘অর্থনীতির সহজ কথা হল, শুল্ক যদি বাড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমবে। আমি আশা করব, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মধ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতির প্রবণতা কমিয়ে আনতে কী করা যায় এবং এক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়, সেই পথনির্দেশ এই ফোরাম থেকে উঠে আসবে।’

এ বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের বিশ্ব নানাভাবে চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতের মুখোমুখি। বিশ্বকে আরও উন্মুক্ত করতে, ঐক্যের বন্ধনকে আরও মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের মোকাবেলা করতে হবে যৌথভাবে; ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির অধিকারকে রক্ষা করতে হবে। উদ্ভাবনী ধারণা ও পদক্ষেপ নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়াতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোতে আরও উদ্ভাবনী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সবার জন্য লাভজনক হয়, সব মানুষের যাতে মঙ্গল হয়, তেমন একটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে, যা গড়ে উঠবে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান এবং ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চেতনা নিয়ে।’

সেজন্য উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক, অংশীদারিত্বমূলক যৌথ উন্নয়নের চেতনা নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে টেকসই ও সুষম উন্নয়নের ওপর, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা এবং সবার জন্য লাভজনক একটি ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। আমাদের যৌথভাবে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

আমরা বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য একটি গ্রুপ হিসেবে একত্রিত হতে পারি, যারা একটি বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করবে।’শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ সবসময় শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছে, যা থেকে সরাসরি উপকৃত হবে জনগণ। একটি বহুমাত্রিক বিশ্বে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আমরা জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাব।’

এশিয়া ও বাইরের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে সবারই সম্পদের জোগান বাড়বে বলে মত দেন প্রানমন্ত্রী। তার ভাষায়, বাণিজ্যের পাশাপাশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব। ‘মানুষে মানুষে এই যোগাযোগই পারে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে দিতে। অবকাঠামো, মুক্তবাণিজ্য এবং উদার বিনিয়োগ নীতিই এশিয়ার বিকাশের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন আমরা অভূতপূর্ব সম্পদ ও সম্ভাবনার হাতছানি দেখতে পাচ্ছি, যেখানে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, শিক্ষার সুযোগ আরও উন্মুক্ত হচ্ছে, শিশুমৃত্যুর হার কমে আসছে এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাচ্ছে। একসময় এসব কল্পনা করাও কঠিন ছিল।’

অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানবতার স্বার্থে বাংলাদেশ যে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, সে কথাও এশীয় নেতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ‘আমরা শুধু মানবিক আবেদনেই সাড়া দিচ্ছি না; এই সংকট যেন বিশৃঙ্খলা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার দিকে না যায়, সে বিষয়েও সচেতন রয়েছি। তীব্র উত্তেজনা ও সংকটের মুখেও এ সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপ ও ঐকমত্য চেয়েছি আমরা।’ তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও টেকসই বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সব বন্ধু ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাবে।

মানবসভ্যতাকে যুদ্ধের বিভীষিকার শিকার হতে হয়েছে বহুবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি বিশ্বাস করি, শক্তিশালী, যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বে দেশে দেশে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামনের দিনের চ্যালেঞ্জগুলো যদি আমরা মোকাবেলা করতে পারি, তা ভালো ফলই বয়ে আনবে।’

আরও জাপানি বিনিয়োগে জাইকার সহায়তা চান প্রধানমন্ত্রী : জাইকার প্রেসিডেন্ট শিনীচি কিতাওকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশের জন্য আরও জাপানি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে জাইকার সহায়তা চান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার লেখক নজরুল ইসলাম পরে ব্রিফিংকালে বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাপানের বিনিয়োগকারীদের নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে আরও বিনিয়োগের অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জাপান আমাদের অনেক সাহায্য করেছে।’ তিনি তরুণ

প্রজন্মের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জাইকার প্রতি আহ্বান জানান। জাইকার প্রেসিডেন্ট অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে মানবসম্পদের বিকাশে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জাইকার প্রেসিডেন্টকে জানান, জাপানের মতোই কৃষি থেকে শিল্পায়নের পথে চলতি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে এগিয়ে চলছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জাপানকে রোল মডেল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলায় জাপানের নাগরিকদের মৃত্যুর কথাও স্মরণ করেন এবং তার দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করেন। জাইকা প্রেসিডেন্ট তৃতীয় মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।

বাংলাদেশ ও জাপানের দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করে জাইকার প্রেসিডেন্ট জানান, তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন। জাইকা প্রেসিডেন্ট জানান, তারা বাংলাদেশে গবেষণা কর্মসূচি আরও জোরদার করবে। অন্যদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা উপস্থিত ছিলেন।

Comments

comments