জয় আচার্যী’র ধ্রুবকথন ৩: একজন পিশাচ কিংবা স্বার্থখোর

ছবিঃ জয় আচার্যী

জয় আচার্যী’র ধ্রুবকথন ৩: একজন পিশাচ কিংবা স্বার্থখোর

সকালগুলো এখন ন্যাতানো আমার। ক্লাস উপেক্ষা করে ঘুমাবার যেই দুর্নিবার আকর্ষণ থাকে, সেটা এখন নেই। ঝিমধরা দেহটা নামিয়ে দেই ঠাণ্ডা মেঝেতে। নিজের স্বার্থেই সব কাজ চলছে, স্বার্থপর ইমোশনগুলো নিয়েই খেলা চলে। যাকে মনে করার, যাকে মিস করছি- তার কথাই ভেবে স্বার্থপর ইমোশনাল লীলাখেলা চলে। বাকীদের কথা মনে করার মানসিকতার কবে শ্রাদ্ধ করেছি- সেটাও মনে পড়ে না।

বাবা মায়ের খুনসুটির মাঝে চেঁচিয়ে উঠি- “আহ! সকাল সকাল বাসা মাথায় না তুললেই কি নয়!” আমার কথা গ্রাহ্য না করে, কিংবা আমারি মত জেদি হবার কারণে, কিংবা আমাকে ইচ্ছে করেই রাগিয়ে মজা নেয়ার জন্যে মা-বাবা চালিয়ে যায় তাদের আদুরে ঝগড়া। আমি আধেক চোখ বুজে, ভ্রু কুঁচকে নাস্তা চালান দেই মুখে। তারপর একসময় নিস্তব্ধ হয় ঘরগুলো। বাবা চ্যানেল ওয়ানের টকশো নিয়ে বসে। সব স্বার্থপর সময় কাটানোর অজুহাত।

এর মধ্যে মনে পড়ে মা কাল রাতে বলেছিল- “ঐ যে মনে আছে? একবার একটা ছেলের সাথে খোয়াই নদীর তীরে ব্রিজে বসেছিলি? তার তো বাবা মারা গেছে গতকাল রাতে।” আমি চমকে মায়ের দিকে তাকাই সাধের ফেসবুকিং ছেড়ে। কিন্ত শুধু একমুহূর্তের জন্যই। আবার ডুব দেই নীল জগতে। অন্যের নীল বেদনা দেখার কিংবা শোনার সময় কই!! একবারও মন আসেনা যে- পারিবারিক সম্পর্কের রেশ ধরে সেই ছেলেটাকে দাদু বলে ডাকতাম। ওর মত ভাই, বব্ধুর সঙ্গ কখনও ছাড়বো না বলে কথা দিয়েছিলাম।

কিন্তু ক্ষণিকের আড্ডার সেই মুহূর্তগুলো পা পিছলে পড়ে যায় স্বার্থপর জীবনের চোরাবালিতে। একটা ফোন দিয়েও জিগ্যেস করার সাহস হয়না দাদুকে। কি বলবো ফোনে? “মন খারাপ করিস না, সবার জীবনেই এমন দিন আসে”…… ইত্যাদি ইত্যাদি? আমার ঘেন্না লাগে নিজের প্রতি। ধর্মান্ধ না হয়েও স্বার্থান্ধ হলাম কিভাবে এতো!

আমি বাবার সামনে গিয়ে আনমনে বললাম-“ আচ্ছা, এখন ওদের চলবে কিভাবে? পেনশনের টাকায় তো বাসা ভাড়াও হয়না।”

বাবা বলল- “একভাবে না একভাবে না চলে যাবে। যেতেই হবে।” তারপর আঁতে ঘা লাগা কিছু কথা বলতে শুরু করলো বাবা-“ আমি যদি এখন মারা যাই, তবে তোমাদের কি অবস্থা হবে সেটা তো চিন্তাও করতে পারছো না এখন।”

আমি বাইরে বাইরে নিশ্চিন্ত ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে স্বার্থপর হৃদয়টা বাবার কথাগুলোকে ব্যাবচ্ছেদ করতে থাকে। বন্ধুর বাবার মৃত্যুভাবনার চেয়ে নিজের বাবার কথাগুলোই ঘুণপোকা হয়ে সারাদিন কামড়াতে থাকে ঘিলু।

সন্ধ্যেবেলা আরেক দফা- বাবার সামনে পকেটে হাত দিয়ে দেখি ১২০টাকা ছাড়া আর কিছুই নেই। বললাম- “একটু বের হতাম। কিন্তু টাকাই যে নেই। কাল সকালে তো এগুলো লাগবে তোমার।”

বাবা হেসে বলে-“ কষ্টের দেখেছো কি তুমি? অভাব এখনো বোঝোনি। একটা কিছু করতে না পারলে বুঝবে তখন।”

আমার স্বার্থপর ইঁদুরপ্রাণ তখন আবার ওঠানামা করতে থাকে ভবিতব্য অনিশ্চিত কিংবা নিশ্চিত দুর্যোগের আশংকায়। নাহ! এভাবে চলবেনা। অস্তিত্ব রক্ষার দায়ে আমি গোছাতে থাকি আমার পরিকল্পনা। পরের বার রেসাল্ট ভাল করতেই হবে……… আর ঐ যে একটা টিউশনি…… ওটাও যদি ……

বন্ধুর বাবার মৃত্যুতে বন্ধু কতটুকু কাঁদল, সেটা জানার মত মানুষ হইনি এখনও। আমি পিশাচ। যার শুধু খাদ্য লাগে বেঁচে থাকার জন্য। এইযে ক্ষণিকের আড্ডা, বন্ধুত্ব, সুখ, দুঃখ- এগুলাও একপ্রকার খাদ্য আমার। নিজের এটুকু সুবিধা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনা আমার।

সেলফিশ!

Comments

comments