জয় আচার্যীর ধ্রুবকথন ৬: দুপুররোদ্রে সেই বৃদ্ধা

ছবিঃ মোস্তাফিজ অঙ্গন

জয় আচার্যীর ধ্রুবকথন ৬: দুপুররোদ্রে সেই বৃদ্ধা

ভারী বইটা মুখের সামনে ধরে শুয়ে ছিল ছেলেটা। আজকাল বিছানায় শুয়ে আর যাই হোক, পড়া হয়না। বইটা পাশে শুইয়ে নিজে চোখ বুজলো। পড়ার অভিনয় বেশিক্ষণ করা যায়না।

কলিং বেল বাজলো এমন সময়। দরজা খুলে দেখে একজন বৃদ্ধা গেটের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন……। তোবড়ানো গাল, ময়লা কাপড়, মাথায় অভ্যাসের ঘোমটা। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বক্তব্য হড়বড়িয়ে বলতে লাগলেন তিনি; যার একটা কথাও ছেলেটা বুঝলো না। কিছুক্ষণ পর “কী বলতেসেন?” প্রশ্ন করার পর জানা গেলো- উনার সাহায্য চাই।

-“আমার স্বামী মারা গেছে বাবা। তুমি আমার ছেলের মত। কিছু সাহায্য করো আমারে। আমি কোরআন শরীফ পইড়া তোমার লাইগা দোয়া করমু।”

এ কথা শুনে পাশের বাসার আন্টিটা বোকা হাসি হাসতে লাগলো। কিংবা হেয় করা হাসি; কারণ ওরকম কতই এসে থাকে। ছেলেটা বিরক্ত হলো ওরকম হাসি দেখে।

বাবা শুয়ে ছিল। ঘরে এসে প্রথমে বাবার সামনেই বাবার শার্টের পকেট হাতড়ে বলে –“দশ টাকা আছে? একজন সাহায্যের জন্য আসছে।”
বাবা বলে- “দশ টাকা কেন? পাঁচ টাকা দাও। টাকাগুলো সব কাল লাগবে।”

ছেলেটা বুঝতে পারে যে বাবাও কোন সম্রাট শ্রেণীয় নন। ঐ বৃদ্ধা আর এই মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে পার্থক্যটা খুব বড় নয়। ছেলেটা ভাবে- “টাকা নেই বলেই কি দেবার মত মন আছে? কিংবা এই অন্যের ‘দুঃখে দুঃখী হওয়া’ ব্যাপারটা কোন কোন মানুষের জন্মগত?”

বাবার কাছ থেকে কোন টাকা নেয়না সে। ভাবে – “কত জানি আছে আমার কাছে…”। দুইশ-র মত আছে। নিজের ব্যাগে টাকাগুলো হাতড়ে বিশ টাকার নোটটা বের করে। ওটা নিয়ে দিয়ে আসে সেই বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা খুশি হয়। গেটের ফাঁকে হাত গলিয়ে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আবারো আশ্বাস দেয় বাড়িতে গিয়েই নামাজে বসে দোয়া চাইবে।

ছেলেটা জানতে চায়- “কই থাকেন?” বৃদ্ধা জায়গাটার নাম বলেন, বয়সের ভারে চাপা পড়া কথাগুলো ছেলেটা বুঝতে পারেনা। জানা যায়, উনার স্বামী মারা গেছেন গত বছর।

-“তোমার মতই একটা ছেলে আসিলো আমার। বিয়া কইরা গেসে গা আলাদা হইয়া। খাইতে পারিনা। আর কেউ নাই। এই যে বিশ ট্যাকা দিলা, আর এই একশো টাকা। এই ই আছে। দুইশ ট্যাকা লাগবো কিনতে।”

-কী কিনবেন?

বৃদ্ধা মুখের সামনে হাত নিয়ে ইনহেলার নেয়ার মত ভঙ্গি করেন। ছেলেটা আহত হয়ে প্রশ্ন করে- “আপনার শ্বাসকষ্ট!!?”

বৃদ্ধা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়েন। আবারো ঘরে চলে যায় ছেলেটা, একশো টাকার নোটটা বের করে বৃদ্ধার হাতে দেয়। ছেলেটারও শ্বাসকষ্ট হয় মাঝে মাঝে। সে জানে – না শুয়ে, না বসে- কোনভাবেই একমুহূর্ত স্বস্তি পাওয়া যায়না এই রোগে।

পাশের বাসার আন্টি হয়তো অবাক হয়, বৃদ্ধার মুখে সীমিত স্বস্তির হাসি। ছেলেটা ভাবে- দৈনিক কত টাকা খরচ হয় ফালতু কাজে? সে হিসাব তো কখনও করা হয়না। ধোঁয়ার পেছনে চলে যায় শতশত টাকা। আর এই বৃদ্ধা দুইশ টাকার জন্য এই ভরদুপুরে ফ্ল্যাটগুলোর সিঁড়ি বেয়ে বেড়াবে হাঁপানি নিয়ে!

মুহূর্তের মাঝে দারিদ্র্য নিয়ে ভাবে ছেলেটা, ভাবে এতো অসহায় লোককে কিভাবে সাহায্য করা যায়? ধনীগুলা কি দেয়ার মত মন নিয়ে জন্মায় নাই? বেলায় বেলায় কেউ মুরগীর ঠ্যাং চিবাবে আর কেউ কেউ তিনবেলায় একদানা ভাতও চোখে দেখবে না! এমন বৈষম্য পুরাপুরি মুছে দিতে ইচ্ছা হয়।
এই বৃদ্ধার মত অনেকেই আছেন যারা কাজ করতে পারেননা এই শেষ বয়সে এসে। কেউ নাই এদের। এদেরকে তবে কে দেখবে!
মনে হয়- শুধুমাত্র এদের জন্যই পয়সা কামাতে।

সিগারেট এখন আর খেতে ইচ্ছে করছেনা ছেলেটার। নিতান্ত তিক্ত মনে হচ্ছে। টাকাগুলো থাকলে হয়তো ধোঁয়া উড়িয়েই শেষ হত। ছেলেটার নিকোটিন কেনার বদলে টাকাগুলো দিয়ে কেউ একজন স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারবে।

Comments

comments