গাইবান্ধায় অভাবে সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন বাবা-মা

গাইবান্ধায় অভাবে সন্তান বিক্রি করে দিচ্ছেন বাবা-মা

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দা ইউনিয়নের রাজবাড়ি গ্রামের হাবিল মিয়া অভাবের তাড়নায় মাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে নিজের সন্তানকে তুলে দেন এক বিত্তবান পরিবারের হাতে। পরে সন্তান বিক্রির টাকা দিয়ে কেনেন বসতভিটা।

একই উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের উত্তর ধর্মপুর গ্রামের ভূমিহীন আশরাফুল ইসলাম অভাবের কারণে তিন বছর ও দু’বছর আগে দুই মেয়েকে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেন।

এ বিষয়ে হাবিল মিয়া কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘আমি চলতে পারি না, গরিব মানুষ। জায়গা জমি নাই। মানুষের জায়গায় থাকি, সেখানে থাকতেও দেয় না। বাচ্চাটাকে বিক্রি সেই টাকা দিয়েই ভাতিজার কাছ থেকে বসতভিটার জায়গাটা কিনেছি।’

অপরদিকে সন্তান বিক্রেতা আশরাফুল বলেন, আমার দু’বার করে যমজ সন্তান হয়েছে। তাদের আমি পালতে পারিনি। অভাবের কারণে দুটো বাচ্চা বিক্রি করে দিয়েছি। একটাকে বিক্রি করে পেয়েছি ৫ হাজার টাকা, অন্যটির বেলায় পেয়েছি ১৫ হাজার টাকা। এই টাকায় সংসারে অনেক উপকার হয়েছে।

gaibandha

উত্তর ধর্মপুর গ্রামবাসীর অভিযোগ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দুর্গম এলাকায় অভাবের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া অনেক মানুষের পাশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বা সরকারি কেউ দাঁড়ায় না। স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানরা টাকা ছাড়া কারো উপকার করেন না।

রাজবাড়ি গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, ভোটের সময় চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপিরা আসেন ভোট চাওয়ার জন্য। কিন্তু ভোট শেষে কেউ আর খোঁজ নেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধর্মপুর গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের আসনের এমপি শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিভিন্ন টেলিভিশনের টকশোতে দেশের উন্নয়ন নিয়ে বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু এই সব মানুষের কাছে কখনও আসেন না ভালো মন্দের খোঁজ নিতে।’

তবে বিষয়টি জানার পর গাইবান্ধ-৫ সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, পরিবার দুটিকে সার্বিক সহযোগিতা করব। তাদের অর্থনৈতিক সকল সহযোগিতা করা হবে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মায়েদের জন্য মাদার’স অ্যাম্বুলেন্স

গ্রামে গর্ভবতী মায়েদের প্রসব ব্যথা উঠলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স বা কোনো গাড়ি পাওয়া যায় না। এ কারণে বাড়িতে জীবন দিতে হয় অনেক গর্ভবতী মাকে। তাছাড়া বেশিরভাগ মানুষ গরিব হওয়ায় টাকার অভাবে নিয়ে যেতে পারে না উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। যদিও এ সেবা ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকে দেয়ার কথা। কিন্তু বেশির ভাগ কমিউনিটি ক্লিনিকে লোকবন না থাকায় এ সেবা বঞ্চিত হয় সেখানকার মানুষ। তবে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত দ্রুত সেবা দেয়ার জন্য সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রতিটি উপজেলায় ব্যবস্থা করা হয়েছে মাদার অ্যাম্বুলেন্সের।

জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪৯০ জন। যার মধ্যে নারীর সংখ্যায় ৭৬ হাজার ১৩১ জন। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এবং সরকারি মাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স হওয়ায় অধিকাংশ মায়ের সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই এ সমস্যা সামাধানের জন্য জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে দুটি মাদার অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করেছে। যার প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ২ লাখ টাকা।

উপজেলা সূত্রে জানা যায়, মাদার অ্যাম্বুলেন্স এক ধরনের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে সংস্কার করে অ্যাম্বুলেন্সের মতো তৈরি করা হয়েছে। এ অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে রয়েছে একটি স্যালাইন রাখার স্ট্যান্ড, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রযোজনীয় সরঞ্জাম, একটি বিছানা এবং রোগীর পাশে দুই থেকে তিনজন বসার ব্যবস্থা। প্রাথমিকভাবে ক্রয়কৃত দুটি মাদার অ্যাম্বুলেন্স পরীক্ষামূলকভাবে ঈদের পর জগন্নাথপুর উপজেলার দুটি দুর্গম এলাকা রানীগঞ্জ ও আশারকান্দি ইউনিয়নে ব্যবহার করা হবে। এদিকে সকল ইউনিয়ন পর্যায়ে এ সুবিধা আসলে গর্ভবতী মায়েদের জন্য অনেক উপকারেই আসবে বলে জানান স্থানীয়রা।

পাটলী ইউনিয়নের বাসিন্দা ফরিদ চৌধুরী বলেন, এটি সত্যিই প্রশংসনীয় কাজ। গর্ভবতী মায়েদের জন্য উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে মাদার অ্যাম্বুলেন্স প্রদান এটি ভালো হয়েছে। এখন দেখার বিষয় এটি যেন ঠিকমতো কাজ করে। কারণ আমরা চাই না যানবাহনের জন্য কোনো মা যেন মৃত্যুর মুখে না পড়ে।

Sunamganj-Ambulence-1

জগন্নাথপুর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. শফিকুল হক বলেন, আমাদের অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন। আমাদের এখানে অ্যাম্বুলেন্স সংকট। তাছাড়া গর্ভবতী মায়েদের জন্য উপজেলা পরিষদ যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি ইউনিয়নে থাকলে ভালো। তবে এটি বড় সড়কে এলে ক্ষতি হবে। এটির ফলাফল যদি ভালো হয়, তাহলে আমরাও পৌর এলাকায় গভবর্তী মায়েদের জন্য এ সেবা চালু করবো।

জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মধুসুধন ধর বলেন, জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ থেকে আমাদের দুটি মাদার অ্যাম্বুলেন্স দেয়া হয়েছে। এটি ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ করবে গর্ভবতী মায়েদের নিয়ে আসার জন্য। আর এখনতো সবাই টমটমে করেই রোগী নিয়ে আসে তাই এটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে রোগীর কষ্ট না হয়। বর্তমানে এটি পরিক্ষামূলকভাবে চলাচল করবে।

জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কুমার দেব বলেন, এটি আপাদত পরীক্ষামূলকভাবে দুটি ইউনিয়নে চলাচলের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এটি বন্ধ আছে। ঈদের পরে এটি জগন্নাথপুরের রানীগঞ্জ ও আশারকান্দি এলাকায় চলাচল করবে। যদি দেখা যায় এর ফলাফল ভালো তাহলে বাকি ইউনিয়নগুলোতেও এটি ছড়িয়ে দেয়া হবে।

জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম বলেন, এটি উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে করা হয়েছে। উদ্যোগটি অত্যন্ত ভালো। কারণ আমরা অনেক সময় প্রান্তিক অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দিতে পারি না। তাই গর্ভবতী মায়েদের কথা চিন্তা করে তাদের সেবার লক্ষে আমরা পরিক্ষামূলকভাবে এ কাজ শুরু করেছি। এ জন্য অ্যাম্বুলেন্সকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আমরা এ ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবো।

Comments

comments