আমি মানসিক নিপীড়নে বিধ্বস্ত: মিন্নি

আমি মানসিক নিপীড়নে বিধ্বস্ত: মিন্নি

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নতুন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ফের আলোচনা সমালোচনা জমে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পোস্ট দিচ্ছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে মিন্নি বলেছেন, ‘কিছু লোক আছে যারা বিষয়টি ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। আমি চরম মানসিক নিপীড়নে ভুগছি। কেউ আমাদের পাশে নেই, সবাই শুধু সমালোচনায় মুখর। আমি সবার সহযোগিতা চাই।’

শনিবার (৬ জুলাই) রিফাত হত্যার নতুন ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে কলেজের প্রধান ফটক থেকে মিন্নিকে নিয়ে রিফাতকে বের হতে দেখা যায়। পরে মিন্নি ফের কলেজের ভেতরের দিকে যান। এ সময় রিফাত মিন্নিকে ভেতরে যেতে বাধা দেন। এরপরই সন্ত্রাসীরা কলেজ গেট থেকে রিফাতকে ধরে সামনের দিকে নিয়ে যায়। মিন্নি তখন পেছন পেছন হাঁটছিলেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই নয়ন বন্ড ও অন্যরা যখন কিল, ঘুসি, লাথি দিতে শুরু করে তখনই মিন্নি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে রক্ষার চেষ্টা করেন।

মিন্নি বলেন, ‘ওইদিন সকাল সোয়া ১০টা হয়তো। রিফাত আমাকে বলে, আব্বু (রিফাতের বাবা) আসছে, চলো তোমার সঙ্গে দেখা করবে। আমি ওকে বলেছিলাম আমার কাজ শেষ করে বের হই। ও আপত্তি করে বলে, আব্বু গেটে অপেক্ষা করছে। আমি তখন ওর সঙ্গে বের হই। গেটের বাইরে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি বাবা কোথাও নেই। তখন আমি বলি, তুমি মিথ্যে বলেছো, চলো রুটিন নিয়ে আসি। আমি ওকে নিয়ে ভেতরে যেতে চাই। ঠিক এ মুহূর্তেই ১০-১২ জন আমাদের ঘিরে ধরে এবং রিশান ফরাজী ওর পথরোধ করে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে ওদের পেছনে হাঁটতে থাকি। পরে যখন আক্রমণ করে তখন প্রতিরোধের চেষ্টা করি। আমি হেল্প চাই অনেকের কাছে। কেউ আসেনি। ওরা চলে যাওয়ার পর রিফাত নিজেই হেঁটে রিকশায় ওঠে। আমার পায়ের পাতা কেটে যাওয়ায় জুতো ছাড়া হাঁটতে পারছিলাম না, তখন জুতো পায়ে দেই। এ সময় একজন আমার হাতে ব্যাগ তুলে দেয়।’

মিন্নি বলেন, ‘আমার কাছে ফোন ছিল না। দুটি ছেলে মোটরসাইকেলে আমাদের রিকশা ফলো করে যাচ্ছিল। আমি তাদের হেল্প চাইলে তারা ধমক দেয়।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে মিন্নি বলেন, ‘বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য দেখেছি। মানসিকভাবে আমি বিধ্বস্ত। আমার অনুরোধ, আমি তো আপনাদের মেয়ে বা বোন হতে পারতাম, আপনারা না জেনে কোনও মন্তব্য করবেন না। আমি চরম মানসিক নিপীড়নে ভুগছি। কেউ আমাদের পাশে নেই, সবাই শুধু সমালোচনায় মুখর। আমি সবার সহযোগিতা চাই।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাইকো স্যোশাল কাউন্সিলর সালমা ইকরাম বলেন, ‘মিন্নিকে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাতে তাকে এখন মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা দেওয়া উচিত।’

বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, ‘নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না চেয়ে মিন্নিকে যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে সেটা আমাদের জন্য সত্যিই লজ্জার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও কিছু বলার আগে একবার আমাদের ভাবা উচিত এটা আমাদের জীবনে কতোটা প্রভাব বিস্তার করছে। তাই মিন্নিকে নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে খুনিদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া উচিত।’

খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য চিত্তরঞ্জন শীল বলেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করা হয়েছে। সেটাকে সামনে না এনে কিছু মানুষ বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই মিন্নিকে সামনে টেনে আনতে চাইছে। আমাদের সবার উচিত রিফাত শরীফের খুনিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।’

সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, ‘তদন্ত একটি স্বচ্ছ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যেহেতু এটি একটি নারকীয় ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড এবং মিন্নি এ মামলার এক নম্বর সাক্ষী, তাই কোনও ব্যক্তিকে টার্গেট করে আমরা তদন্ত করছি না। আমরা সার্বিক সব বিষয় নিয়েই তদন্ত প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছি। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সার্বিকভাবে যতটুকু বিষয় আমাদের সামনে আসছে আমরা সে বিষয় নিয়ে কাজ করছি।’

রিফাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে গত ২ জুলাই ভোর রাতে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত তিন জনসহ ছয় জন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। পরে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিন বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত মারা যান।

Comments

comments